‘আলোকে চিনে নেয় আমার অবাধ্য সাহস’ এই স্লোগানকে ধারণ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ৪০তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৯ নভেম্বর, ২০২০) সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে উদ্বোধন করেন, আন্দোলনরত পাটকল ও চা শ্রমিকবৃন্দ।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়ের সঞ্চালনায় ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেলের সভাপতিত্বে ও বর্তমান এবং প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কর্মীদের উপস্থিতিতে ৪০তম জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মনীষী রায়, সহ-সভাপতি দীপক শীল, চা শ্রমিক নেতা মুকেশ কর্মকার অনুপ, পাটকল শ্রমিকনেতা এস এ রশীদ প্রমুখ।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তারা বলেন, “‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ সতের কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছুটে চলছে নিয়ন্ত্রণ হারানো বাংলাদেশ৷ চালকের আসনে বসা ব্যক্তিটিও জানেন না গন্তব্য। অন্যদিকে সমগ্র দুনিয়াব্যাপী শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারির তান্ডব। ভগ্ন স্বাস্থ্যখাতের বাংলাদেশ অদৃশ্যের উপর নির্ভর করেই পাড়ি দিচ্ছে মহামারির দুরন্ত সায়র৷ একইসঙ্গে অগণতান্ত্রিক সরকারের জুলুম-নিপীড়ন, লাগাতার ধর্ষণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীনদের সন্ত্রাস, দুর্নীতির দৌরাত্ম্যসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই একটি পরিচিত চিত্র দেশটির সমগ্র শরীরে আঁটসাঁটভাবে লেগে রয়েছে৷ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের দিন রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূর ধর্ষণের ঘটনা একটা আলামত ছিল মাত্র৷ তারপর গত দুই বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার বেড়েছে দ্বিগুণ৷ এতো কিছুর পরও ধর্ষণ বিষয়ে সরকার গৃহীত দৃশ্যত পদক্ষেপ দেখেনি দেশবাসী৷ সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত সিলেটের এমসি কলেজ, খাগড়াছড়িতে আদিবাসী কিশোরীকে ধর্ষণ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনাসহ সকল ধর্ষণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিবাদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সমমনা সংগঠন ও দেশের সচেতন মানুষদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে৷
বক্তারা বলেন, এই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও সরকারের পুলিশ ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, যুব সংগঠন যুবলীগ দফায় দফায় হামলা চালায়৷ তবে, যতোই বাধা বিপত্তি আসুক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন অতীতের মতোই সকল বাধা বিপত্তি দূর করে এই অমানবিক বর্বোরচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব থাকতে বদ্ধপরিকর৷
বক্তারা আরও বলেন,বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির তান্ডবে মানুষ জীবন মরণের গভীর দোলাচলে দোলায়মান৷ মারাত্মক ছোঁয়াচে কোভিড-১৯ জনঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ বিপদজনক বার্তা বয়ে আনলেও সরকারের উদাসীন আচরণ দেশের মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়৷ মহামারির এই সময়েও স্বাস্থ্যখাতে সীমাহীন দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অমানবিকতার দিকটি প্রকটভাবে লক্ষণীয়৷ করোনা সংক্রমণের মাস খানেকের মধ্যেই করোনা রোগীদের জন্য কোনো আইসিইউ বেড সংকুলান হচ্ছিল না৷ অতীতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হলেও এই করোনার সময়ে এসে এই দাবি আমলে নিয়েছে সরকার, ঘোলা করে জল পান করার চিরায়ত অভ্যাসটুকু জিইয়ে রেখে৷ একদিকে মহামারির ভয় ও লকডাউন, অন্যদিকে ঘরে চাল নাই৷ লকডাউনের সময় দেশের সবচেয়ে পরিচিত চিত্র এটি৷ দেশের প্রায় দশ কোটি ২২ লাখ মানুষের আয় পঞ্চাশ থেকে আশি শতাংশ কমে গিয়েছে৷ পাঁচ কোটির অধিক মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে৷ এই ভয়াবহ চরম দুর্যোগের সময়েও সরকারি অপর্যাপ্ত ত্রাণে ভাগ বসিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতারা ও স্থানীয় জনপ্রশাসন৷ এই দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ সরকার তেমন কোন স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। করোনা মহামারিতে ভগ্ন শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বক্তারা বলেন, মার্চের ১৭ তারিখ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার হওয়ার পর অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী বিদ্যায়তনিক শিক্ষা থেকে স্থায়ীভাবে দূরে চলে গেছে৷ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো টিউশন ফি আদায় করার ঘৃণ্যতম প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে৷ অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে ছাড়াই পাঠকার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে৷ ছাত্র ইউনিয়ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ টিউশন ফি মওকুফের দাবিতে এই মহামারির সময়েও আন্দোলন সংগঠিত করেছে৷ দেশব্যাপী ধর্ষণের ধ্বংসলীলা, করোনা মহামারির আঘাতে ল-ভ- স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, অর্থনীতি, আওয়ামী লীগের একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন , লাগামহীন দুর্নীতি তার সাথে এখানকার সহিষ্ণু সংস্কৃতির প্রাঙ্গণে দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষবৃক্ষসহ সব অশুভ শক্তিকে মাথায় রেখেই এই তমসা কাটানোর অঙ্গীকারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে চায় সহস্র অবাধ্য সাহস৷”
উদ্বোধনী সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল।
উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিএমএ মিলনায়তনের সম্মুখে এসে সমাপ্ত হয়।





0 মন্তব্যসমূহ