Subscribe Us

header ads

বিশ্বজিৎ হত্যার আট বছর | দর্পণ

বিশ্বজিৎ, বিশ্বজিৎ হত্যা, বিশ্বজিৎ দাস, দর্পণ, বাংলাদেশ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, বরিশাল, হত্যাকান্ড


আজ ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজিৎ হত্যার আট বছর পুরোন হল

বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ রবিবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে।

সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের সন্তান বিশ্বজিতের বাবার নাম অনন্ত দাস, মায়ের নাম মা কল্পনা রানী ঘোষ। সে ছিল শান্ত প্রকৃতির মানুষ। হাঙ্গামা-হুজ্জত একেবারেই পছন্দ করতো না। একটু ভীরু স্বভাবী ছিল। মিছিলে কখনো যায় না। রাজনীতি করতো না। ২০০৬ সালে ঢাকার শাঁখারী বাজারে দর্জির কাজ শুরু করে বিশ্বজিৎ। দোকানের নাম ছিল নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্স। বড় ভাইয়ের দোকান।

হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে গোপন বৈঠক করে। ঐ গোপন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে অবরোধের পক্ষে কেউ মিছিল বের করলে তাদের ওপর হামলা চালাতে হবে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা সহযোগিতা থাকবে।

৯ই ডিসেম্বর ২০১২ ১৮ দলীয় জোট সরকারবিরোধী অবরোধ কর্মসূচির দেয়। এই কমর্সূচীর সমর্থনে সকাল ৯টার দিকে পুরোনো ঢাকা জজ কোর্ট থেকে সরকারবিরোধী আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। আক্রান্ত আইনজীবীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। 

এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইউনুছ বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে। তার নির্দেশে পথচারী বিশ্বজিতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রফিকুল ইসলাম শাকিল, মাহফুজুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, কিবরিয়া, কামরুল ইসলাম, শাওন, মীর মো. নূরে আলম লিমন, ইমদাদুল হক, সুমন, ওবায়দুল কাদের ও রাজন। ধাওয়া খেয়ে হিন্দু পথচারী বিশ্বজিৎ দৌড়ে প্রথমে নিকটস্থ ভবনের দোতলায় অবস্থিত একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় গ্রহণ করে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঐখানে ক্লিনিকে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি চালানো হয়। তার গায়ে লোহ শলকা দিয়ে সজোরে আঘাত করা হয়। আহত বিশ্বজিৎ প্রাণ বাঁচাতে পাশের আরেকটি ভবনে ঢুকে পড়ে। 

পশ্চাদ্ধাবন করে সেখানেও বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা। ৮-১২ জনের একটি মৃত্যুকামী দল তাকে আঘাত করতে থাকে, পেটানো হয় সবল লৌহ শলাকা দিয়ে। যে রড দিয়ে পিটিয়েছে ও পরে বিশ্বজিতের শরীরে রড ঢুকিয়ে দেয় তার নাম মাহফুজুর রহমান। মাহফুজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র। পিতার নাম আব্দুল আহাদ। তার বাড়ি হাতিয়ার চরকৈলাশ এলাকায়। চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হতে থাকে। 

যে চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিৎকে কুপিয়েছে তার নাম রফিকুল ইসলাম শাকিল, পিতার নাম আনছার আলী, বাড়ি পটুয়াখালী জেলা সদরে। তার পরনে ছিল সাদা শার্ট। সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র। বিশ্বজিৎ এর কাপড় ছিঁড়ে যায়, সারা শরীরে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। সে আবার পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আঘাত অব্যাহত থাকে। সে এক পর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাহফুজুর রহমান বিশ্বজিতের শরীরে রড ঢুকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। 

পথচারীদের কয়েকজন বিশ্বজিৎকে পাশের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা বাধা দেয়। প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় উঠে দৌড় দেয়; কিন্তু শাঁখারীবাজারের একটি গলিতে গিয়ে ঢলে পড়ে যায়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় এক রিকশাওয়ালা তাকে নিকটস্থ মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। অচিরেই মৃত্যু এসে তাকে সকল আক্রমণের ঊর্দ্ধে নিয়ে যায়।

পরবর্তিতে বিশ্বজিৎ দাশ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করা হয়। একই সঙ্গে নিহত বিশ্বজিৎ দাসের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন করা হয়। এছাড়া ঘটনার সময় পুলিশের নিস্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তার রুল জারিরও আবেদন করা হয়। ১১ই ডিসেম্বর জনস্বার্থে রিট পিটিশন দাখিল করেন হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. মো. ইউনূস আলী আকন্দ। হাইকোর্টের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ঘাতকদের আটকের জন্য সরকারকে আদেশ প্রদান করে।

বিচারের নামে অবিচার

দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলা পরিচালনা করা হয়। ৮ ডিসেম্বর, ২০১৩ বুধবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বাকি ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড, এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন আদালত। তবে আসামীদের মধ্যে মাত্র আটজন গ্রেপ্তার ছিলেন, এবং বাকি ১৩ জন ছিলেন পলাতক।

পরবর্তীতে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ড পাওয়া ৮ জনের মধ্যে ২ জন বেকসুর খালাস তারা হল ১. সাইফুল ইসলাম, ২.কাইয়ুম মিয়া, ৪ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন তারা হল ১.জি এম রাশেদুজ্জামান ওরফে শাওন, ২. মাহফুজুর রহমান ওরফে নাহিদ, ৩. ইমদাদুল হক ওরফে এমদাদ, ৪.নূরে আলম এবং মাত্র ২ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট তারা হলেন ১.রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল, ৩.রাজন তালুকদার। সেই সাথে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া দুইজন আসামীকেও খালাস দেওয়া হয়। ২০১৭-০৭-১১ তারিখে মঙ্গলবার বিকালে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে তারা মুক্তি পান বলে জেলার বিকাশ রায়হান জানান। এরা হলেন বরিশালের আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়ার আতিকুর রহমানের ছেলে এএইচএম কিবরিয়া (৩১), মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার রাজৈরের আশেক উদ্দিনের ছেলে গোলাম মোস্তফা (২৬) এবং নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চন্দনবাড়ির আব্দুল হাইয়ের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৪)। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেলার বিকাশ রায়হান জানান, উচ্চ আদালতের আদেশ মঙ্গলবার দুপুরে কারাগারে পৌঁছার পর যাচাইবাছাই শেষে বিকাল সোয়া ৪টার দিকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

মূল আসামীদের মধ্যে হাইকোর্টের রায়ের পরে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর সংখ্যা ২১ থেকে ১৭তে নেমে আসে। গ্রেপ্তার হওয়া মাত্র একজনের মৃত্যুদন্ড, এবং ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড রায় বহাল আছে। বাকি ১৩ জন এখনও পলাতক। রায়ের প্রতিক্রিয়াতে হতাশা ব্যক্ত করেন বিশ্বজিতের পরিবার।


"পাঁচ বছর পরে আজকে আরেকটা দু:সংবাদ এটা। আজকের দিনটাতে যে এরকম কিছু শুনতে হবে আমরা আশাই করিনি। এটাই ঠিক যে সরকার যা চাইবে তা-ই হবে। সরকার যদি চাইতো যে অন্তত বিশ্বজিৎ এর ঘটনাটা সুষ্ঠু বিচার হোক-তাহলে হতো। কোথায় আটজনের মৃত্যুদন্ড সেখানে আসলো দুইজনে। কি বলবো বলার ভাষা নাই"। - বিশ্বজিৎ দাসের ভাই উত্তম দাস। 

এখনো ১২জন আসামি পলাতক। যারা হলেন: রাজন তালুকদার, নূরে আলম, খন্দকার ইউনুস আলী, আলাউদ্দিন, ওবায়দুল কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান আজিজ, আল আমিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান, মোশাররফ হোসেন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ